প্রচ্ছদ / ভ্রমন / বিস্তারিত

For Advertisement

750px X 80px

Call : +8801911140321

প্রকৃতির রাজ্যে সারাবেলা

কারেন্ট নিউজ বিডি   ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫:২৬:০৩

দেখার চোখ থাকলে সবই সুন্দর। প্রকৃতির রূপ-লাবণ্যের নির্যাস পেতে হলে চাই অন্তরদৃষ্টি। কবিগুরু এ জন্যই লিখেছিলেন- দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে দু’পা ফেলিয়া একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু। কবিতার কথাগুলো আমাদের দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুদের জীবনে পুরোটাই যেন সত্যি হল এবার। বহুবার গিয়েছি নিছক আড্ডা জমাতে সাভার নামাবাজার নতুন ব্রিজ পার হয়ে ফোর্ডনগরের রূপনগর। অথচ খড়ারচর, ফরিঙ্গা আরেকটু এগিয়ে কাংশা কিংবা ফোর্ডনগরের প্রথম খণ্ড যাওয়া হয়নি। বর্তমানে ফোর্ডনগর পরিধির প্রথম খণ্ড মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর ও দ্বিতীয় খণ্ড পড়েছে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলায়। কিন্তু এ দুটো খণ্ডতেই সাভারবাজার রোড দিয়ে যাওয়া খুবই সহজ ও কাছে। হুট করেই একদিন দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা ঘুরতে চলে যাই। সংগঠনের এডমিন লেভেলের বন্ধুরা বেশ কয়েকটা মোটরবাইকে সাতসকালেই ছুটে যাই খড়ারচর গ্রামে। ঘুরে বেড়াই ছবির মতো সুন্দর গ্রামের আশপাশে। মায়াবী পথে ঘুরতে ঘুরতে চলে যাই মানিকগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত, ধলেশ্বরী নদীর তীরের গ্রাম কাংশা। আশ্চর্য হই ঢাকার এত পাশে অথচ এখনও রয়েছে খাঁটি গ্রামবাংলার রূপ। কাংশার প্রকৃতি দেখলে বিশ্বাসই হবে না যে, এখানকার দূরত্ব কোলাহলের শহর ঢাকার জিরো পয়েন্ট হতে আনুমানিক প্রায় ৩৭ কিলোমিটার মাত্র। চারপাশটা নয়নাভিরাম প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা। নেই কোনো কোলাহল।

কাংশা ব্রিজের ওপর থেকে শান্ত ধলেশ্বরীর রূপ দেখি। একটা সময় আর লোভ সামলাতে না পেরে, ঝাঁপিয়ে পড়ি নদীর বুকে। চলে ইচ্ছামতো জলকেলি। পানির নিচের কাদা দিয়ে সারাশরীর মেখে, হারিয়ে যাই শৈশবের স্মৃতিতে। নদীর পাড়ে বসে থেকে মাঝ বয়সীদের এরকম ছেলেমিপনা উপভোগ করে আরেক মাঝবয়সী স্থানীয় মাজের আলী। তারে জিগাই ও ভাই কি দেহেন। তিনি উত্তর দেন, পাগলামি দেহি। হা হা হা- কন কি ভাই! আমরা কি পাগল? মাজের আলী বলেন, আমিওত আরেক পাগল। পাগল না হইলে কি আর আপনাগো গোসল করা আমি বইয়া দেখি। বাহ্ বেশ যুক্তিসঙ্গত উত্তর। ভালো লেগে গেল মানুষটারে। জুমার আজান হতেই পানি হতে উঠে আসি। নয়া আমদানি মাজের পাগলও হল আমাদের সঙ্গী। এবার দে-ছুটের দামালদের আর পায় কে। স্থানীয় পাগল বলে কথা। হি হি হি করে হাসলাম সবাই। নামাজ পড়ার জন্য তার সঙ্গে চলে গেলাম কাংশা ব্রিজের ওপারে। জুমা শেষে গ্রামটা ঘুরে দেখি। পেটে এবার চোচো। দুপুরের খাবারের জন্য আবারও চলে যাই, আগে থেকেই আয়োজন করে রাখা খড়ারচর মাদ্রাসার মেহমানখানায়। বেশ আয়েশ করেই উদোর পূর্তি চলে। খাওয়া-দাওয়া শেষে যাই ফড়িঙ্গা গ্রামে। বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠের মাঝে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছে এক পুরনো বট বৃক্ষ। খানিকটা সময় চলে সেখানে আড্ডা। এবার চলে যাই বংশি নদীর তীরে কাজিয়ালকুণ্ডু গ্রামে। যার বুক চিড়ে নতুন পিচ করা সড়ক চলে গেছে আরিচা মহাসড়কের ঢুলিভিটার দিকে। পথের দু’পাশে সৃজন করা হয়েছে বনায়ন। বেশ চমৎকার নিরিবিলি পরিবেশ। সড়কের পাশেই বিশাল বিল। জেলেরা আপন মনে মাছ ধরে। সেই সব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দেখতেই ছুটি চৌঠাইল গ্রামের দিকে। মাঝে রূপনগরের দিগন্ত বিস্তৃত মাঠজুড়ে, সরষে ফুলের রূপে মজে খনিকের জন্য দিলাম ব্রেক। যতদূর চোখ যায়- শুধু হলদে রাঙ্গা সরষে ফুল। আকাশে উড়ে বেড়ায় দূর দেশ থেকে আসা পরিযায়ীর দল। আমরাও বেশি দেরি না করে ছুটে চলি আড়ালিয়া হয়ে চৌঠাইল।

For Advertisement

750px X 80px
Call : +8801911140321

পড়ন্ত বিকালে গ্রামের পিচঢালা সুরুপথে মোটরবাইকে চড়ে বেড়ানোর মজাই আলাদা। বাইকার আর সাইক্লিস্টদের রাইডের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় একটা জায়গা এই পথগুলো। চলতে চলতে অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই চৌঠাইল। এপাশটায় ধলেশ্বরী সরু খালের রূপ ধারণ করে আছে। সম্ভবত নদী খেকোদের শকুনি দৃষ্টি পড়েছে। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনও অসাধারণ। সবুজ ফসলের ক্ষেত, বাঁশবাগানে নানা পাখির কিচিরমিচির, কৃষকের মিষ্টি হাসি, গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর অনুসন্ধানী জিজ্ঞাসাগুলো লেগেছিল বেশ। ঘুরে ঘুরে সব মিলিয়ে ভ্রমণের নির্যাস নিতে নিতে এক সময় দেখি, তেজোদীপ্ত লাল সূর্যটা সেদিনের জন্য নানা রঙের আভার ছটা ছড়িয়ে পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। ত্বরিত গতিতে জসিম ও হানিফ ধলেশ্বরীর তীরে তাঁবু টানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দুর্যয় বারবিকিউ মুরগির খোঁজে বাজারে ছুটে। আর আমি বান্দা অলস, শুধু চেয়ে চেয়ে ওদের দৌড়-ঝাঁপ দেখি। বাদ মাগরিব শুরু হয় ভরা জ্যোস্নার আলোতে মুরগি পোড়ার কাহিনী। হিম হিম বাতাসে তপ্ত আগুনে ঝলসানো মুরগির গোশতের সঙ্গে, ভরা পূর্ণিমার চাঁদটাকে মনে হয় যেন-

সদ্য ভাজা নানরুটি। এরকম জায়গায় ঘুরতে গেলে, যে কাউকেই আনমনে বিড় বিড় করে গেয়ে উঠতে হবে, আমি একবার দেখি/বারবার দেখি/ দেখি বাংলার মুখ। আসলেই তাই। কিন্তু যার দ্বিতীয় খণ্ডে এত রূপ তার প্রথম খণ্ডের প্রকৃতিতে, না জানি আরও কত মায়াবী নৈসর্গিক লাবণ্য মিশানো। তবে কি পাহাড়ের গহীনে যাওয়া দে-ছুট ভ্রমণ বন্ধুরা, বাড়ির পাশের ২য় খণ্ড না দেখেই থাকবে। না তা কখনই হতে পারে না। তাই আবারও একদিন কুয়াশার চাদরে মোড়ানো খুব ভোরে চলে যাই প্রথম খণ্ড দর্শনে। এবার ব্রিজ দিয়ে না গিয়ে সাভার থানা রোডের ভাগলপুর গ্রামের বংশি নদীর বালুর ঘাট হতে খেয়ায় পার হই। নদী পার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের মেঠোপথে ঢুকে পড়ি। যতই যেতে থাকি ততই যেন মুগ্ধতা ভর করে। দারুণ দারুণ সব নয়নাভিরাম দৃশ্য। এক সময় ফসলের আইল ধরে হাঁটতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, দেশীয় নানা পদের অধিকাংশ সবজির চাহিদাই যেন মিটিয়ে থাকে এই ফোর্ডনগর। পৌষের হিম শীতল বাতাসে, বেশ ভালোলাগার প্রাতঃভ্রমণ। দূর থেকেই চোখে ধরা দেয় গোলাপ ও গ্ল্যাডিওলাস বাগানের নজরকাড়া সৌন্দর্য। পথেই দেখা মিলে চন্দ মল্লিকা ফুলের বাগান। লাল, গোলাপি, সাদা, বেগুনি গ্ল্যাডিওলাস বাগানের সামনে যেতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ি। বাংলার রূপ পুরোটাই যেন এপাশটায় ভর করেছে। গাড় লাল আর সাদা এ দুটো রঙের ফুলের বাগানই বেশি। কুয়াশা ভেদ করা চিকচিক রোদের আলো ফুলের গায়ে খেলা করে। বাগানভর্তি ফুটন্ত গ্ল্যাডিওলাস। চারপাশে ঘন সবুজ গাছগাছালি। আহ্ কি অপার্থিব সুখ। প্রকৃতির এরকম দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যে- আমরা সবাই বিমোহিত হয়ে পড়ি। তখন আমার চিৎকার করে বলে উঠতে ইচ্ছা করেছিল, এই বাংলায় জন্মে আমি হয়েছি ধন্য। যুগের পরিক্রমায় ভাগ হয়ে যাওয়া দুই খণ্ডের ফোর্ডনগর জুড়েই, আজও চিরায়িত গ্রাম-বাংলার অনিন্দ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভর করে আছে। সীমানা ভাগ হলেও, ফোর্ডনগরের নজরকাড়া সৌন্দর্যকে কেউ ভাগ করতে পারেনি। বরং ফুলচাষীরা যেভাবে জমির পর জমি গ্ল্যাডিওলাসের চাষাবাদ শুরু করেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে সারা দেশের ফুল ও ভ্রমণপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হবে ফোর্ডনগরের গ্রামগুলো। একদা জলদস্যুদের আক্রমণ হতে নিরাপদ থাকার জন্য, ওলন্দাজ পুর্তগিজদের তৈরি ফোর্ড কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও এখন যেন তা ক্রপ ফোর্ড মানে ফসলের দুর্গ। ফুল চাষীরাও যদি তাদের চাষাবাদ অব্যাহত রাখেন, তাহলে হয়তো একদিন ফোর্ডনগর নামটি মানুষ ভুলে গিয়ে ফুলেরনগর হিসেবেই চিনবে। যেমনটা সাদুল্লাপুর এখন গোলাপ গ্রাম হিসেবেই বেশি পরিচিত। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে জানতে পারলাম, দেশি গরুর খাঁটি দুধ আর খাসের চর/মিরের চর গ্রামে আবহমান বাংলার শীত ঐতিহ্যের খেজুর রসের স্বাদও নেয়া যাবে। কিন্তু ততক্ষণে সুর্যিমামা মাথার উপরে। কি আর করা- তাই সেদিনের মতো রসের লোভ সংবরণ করেই ফিরতি পথে চলি।

যাবেন কিভাবে : গুলিস্তান, গাবতলী বা অন্যকোনো বাসস্ট্যান্ড হতে আরিচা/ সাভারগামী বাসে যেতে হবে সাভারবাজার বাসস্ট্যান্ড। সেখান হতে রিকশা/অটোতে নামাবাজার। ব্রিজের সামনে থেকে ভাড়ায়চালিত মোটরবাইক/অটোতে রূপনগর, কাজিয়ালকুণ্ডু, চৌঠাইল, খড়ারচর, কাংশাসহ ফোর্ডনগর ১ম খণ্ডের গ্রামগুলোতে ঘুরা যাবে।

খরচপাতি : সারা দিনের ঘোরাঘুরির জন্য জনপ্রতি ৫০০/৬০০ টাকা হলেই চলবে। তবে খরচের ব্যাপারটা অনেকটাই নিজেদের সামর্থ্যরে উপর নির্ভর করে।

ভ্রমণ তথ্য : সড়কপথ ভালো। নিরাপত্তাও রয়েছে যথেষ্ট। চাইলে পরিবারের সবাইকে নিয়েও ঘুরে আসা যাবে। ফোর্ডনগর / নামাবাজার ব্রিজ আঞ্চলিক ভাষায় ফুটনগর নামেও পরিচিতি রয়েছে। খুব সকালে চলে গেলে একদিনেই ফোর্ডনগর প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড ঘুরে আসা যাবে।

লেখক : মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম।

For Advertisement

750px X 80px

Call : +8801911140321

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: