প্রচ্ছদ / সিলেট / বিস্তারিত

সুনামগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নির্বাচনী প্রচারণা

১৯ মে ২০১৮, ৪:১১:০৫

ঢাকা, ১৯ মেকারেন্ট নিউজ বিডিআসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকায় আ.লীগ-বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে, চলছে গণসংযোগ ও মতবিনিময়। আ.লীগ-বিএনপির মর্যাদার লড়াই এই আসন ঘিরে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তরুণরাই বেশি।

আ.লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন দুবার এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। সেই সাথে জলমহাল, বালিমহাল ও দখলের অভিযোগও তুলছেন প্রতিদ্বনদ্বী সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ-১ আসনটি অবহেলিত হলেও সম্পদশালী ও নান্দনিক হাওর জনপদ। ধর্মপাশা, মধ্যনগর, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ চারটি থানা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনটি। ৪৬ বছর যাবত এটি একটি চরম অনুন্নত কিন্তু খুব সম্পদশালী ও নান্দনিক হাওর জনপদ। স্বাধীনতার প্রথম দিকে জাতীয় সরকার থেকে সহায়তা তেমন পাওয়া যায়নি, কিন্তু ১৯৯৬ পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ২০০৮ সাল থেকে এই এলাকার উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ নজর দেন ও অপরিমেয় সাহায্য সহযোগিতা করেন।

কিন্তু নির্বাচিত সাংসদের  অদক্ষতা ও নেতৃত্ব দুর্বলতার কারণে, এলাকাবাসীর মতে তার চরম দুর্নীগ্রস্ততার কারণে এলাকায় উন্নয়নের নামে যা হয়েছে সেটি আজাব অনেক রাস্তাঘাট যান চলাচলের অনুপযোগী, হাওড় অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে জন চলাচলের কোন পথ নেই বল্লেই চলে। অনেকের ধরণা তিনি সম্পদটা ঠিকই আস্বাদিত করেছেন, কিন্তু  জনপদ আর এর নান্দনিকতাকে করেছেন পদদলিত। তবে এ অভিযোগ বিগত বিএনপির সাংসদের বেলায়ও পাওয়া যায়। পার্থক্যটা হল বর্তমান সাংসদ সরকারের  কাছ অনেক সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছেন কিন্তু সেগুলোকে পরিকল্পিত, স্থায়িত্বশীল ও মানসম্মত উন্নয়নে রুপ দিতে পারেননি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সাথে দূরত্ব তৈরি করেন এবং জামাত- বিএনপিকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ উঠে। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে উপজেলা পর্যায়ের কিছু রাস্তার মানসম্মত সংস্কার কাজ চলছে এবং স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে দূরত্ব কামানোর চেষ্টা চলছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, এ আসনে ১৯৭৩ সালে আবদুল হেকিম চৌধুরী আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি থেকে সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল, ১৯৮৬ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট থেকে কমরেড বরুণ রায়, ১৯৮৮ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে বদরুদ্দোজা আহমেদ সুজা, ১৯৯১ সালে ঐক্যজোট থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে নজির হোসেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল, ২০০১ সালে বিএনপি থেকে নজির হোসেন ও ২০০৮ সালে মোয়াজ্জেম হোসেন রতন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোয়াজ্জেম হোসেন রতন আবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান।

তবে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আ.লীগের সুনামগঞ্জ-১ আসনে নতুন পুরনো একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীর নাম শোনা যাচ্ছে। সুনামগঞ্জ-১ আসনে বর্তমানে সাংসদ রয়েছেন ইঞ্জিনিয়রি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন।

সাবেক দুই বারের সাংসদ অ্যাডভোকেট সৈয়দ রফিকুল ইসলাম (সুয়েল), জেলা আ.লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাচনাবাজার ইউনিয়নের দুই বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম, সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিকুল হাসান চৌধুরী, সিলেট জেলা আ.লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাড. রনজিত সরকার, সাবেক যুগ্ম সচিব বিনয় ভুষণ তালুকদার, কেন্দ্রীয় আওয়ামী কৃষকলীগের মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামীমা শাহরিয়ার, সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাভোকেট আক্তারুজামান সেলিম। শেখ হাসিনার প্রিয়জন হিসেবে পরিচিত উন্নয়নকর্মী ও বঙ্গবন্ধু পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার আহবায়ক ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার মনোনয়ন চাইবেন বলে মাঠে ঘাটে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। উভয়েই কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রিন সিগন্যালের কথা বলে মাঠ পর্যায়ে গণসংযোগ শুরু করেছেন।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকায় মাঠে দেখা গেছে বিএনপির ৭জন মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে প্রচারনা চালিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দুবারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য নজির হোসেন দলীয় নেত্রীর গ্রিন সিগ্যানালে চষে বেড়াচ্ছেন গ্রামগঞ্জ ও স্থানীয়দের সাথে মতবিনিময় করছেন। তিনি সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে দীর্ঘ ৮ বছর দলের বাইরে ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি জেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি সহ-সভাপতি ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মোতালিব খাঁন,সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি সহ-সভাপতি ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ শান্ত ও যুক্তরাজ্য প্রাবাসী ব্যারিস্টার হামিদুল হক আফিন্দী লিটন মাঠ পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের সাথে মতবিনিময় ও গণ সংযোগে ব্যাস্ত রয়েছেন। তবে এ আসনে আ.লীগ-বিএনপির মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের কথা জানিয়েছে স্থানীয়রা।

এ ব্যাপারে আ.লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন জানান, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর কোনো সংসদ সদস্য এত উন্নয়ন করতে পেরেছেন কিনা ভোটাররাই বলতে পারবেন। আগামী নির্বাচনে দলীয় সভানেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে আরও উন্নয়ন করতে নিজেকে বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। তবে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলে তার পক্ষেই কাজ করব।

প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সুনামগঞ্জ-১ আসনের ৪ বার নির্বাচিত সাংসদ সদস্য মরহুম আব্দুল হেকিম চৌধুরীর সফলতা ও বিভিন্ন গুনাবলির কথা তুলে ধরে স্মৃতিচারণ করে সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিকুল হাসান চৌধুরী বলেন, আমার আব্বা মরহুম আব্দুল হেকিম চৌধুরীর এই সুনামগঞ্জ-১ আসনে ৪বার সাংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের সর্বস্তরের জনগনের আজীবন খেজমত করে গেছেন।

তিনি এই সুনামগঞ্জে জনগনের সেবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তারেই সন্তান হিসেবে আমি সারাজীবন জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের আর্দশের রাজনীতি করে এসেছি, আওয়ামী লীগের তৃণমুলকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ট নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাড়িয়েছে। তাঁরই একজন সৈনিক হয়ে বিগত সকল জাতীয় নির্বাচনে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করতে আমি সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকায় আজীবন কাজ করে আসছি।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সাথে আলোচনা করে আমি আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে নির্বাচন করতে চাই। আমার বিশ্বাস সুনামগঞ্জ-১ আসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাকে মনোনিত করবেন তাহলে আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও প্রকৃত নেতাকর্মীদেরকে নিয়ে এ আসনটি  উপহার দিতে পারব বলে আশা রাখি।

আ.লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী আরেক নতুন মূখ ড.মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, আমার মতাদর্শ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি। জননেত্রী শেখ হাসিনা মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ নেতৃত্ব পছন্দ করেন। তিনি বিশ্বের শীর্ষ দশ নেতার মধ্যে একজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি আমাকে মনোনয়ন দান করেন আমি আমার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংগঠনিক কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিষ্ঠার সাথে দল, এলাকা ও দেশের জন্য কাজ করব এবং তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারব বলে মনে করি।

ডাক্তার রফিকুল ইসলাম চৌধুরী নিজেকে এ আসনের বিএনপির যোগ্য প্রার্থী দাবি করে তিনি বলেন, এক এগারোর পর থেকেই আমি এলাকায় থেকে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে দলীয় সকল কর্মসূচিতেই অংশ গ্রহণ করে আসছি। এই জুলুমবাজ সরকারের আমলে সারা দেশে বিএনপি নেতাদেরকে কোণঠাসা করে রাখলেও আমি ডাক্তার রফিক চৌধুরী মাঠে আছি এবং থাকব। তিনি বলেন , আওয়ামীলীগ নেতা কর্মিরা আমাকে দমিয়ে রাখার জন্য তারা আমাকেসহ আমার দলের স্থানীয় প্রায় আড়াই শতাধিক নেতা-কর্মীকে আসামি করে ৩টি মিথ্যা মামলায় আমাদেরকে জেল খাটিয়ে তারা আমাকে বা আমার দলের নেতা-কর্মীদেরকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

ডাক্তার রফিকুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন,  দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া যদি আমার আমলনামা বিচার করে আগামি নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেন এবং সুষ্টু নির্বাচন হয় তবে আমি নিশ্চিত এ আসনে বিজয়ী হব বলে আমার বিশ্বাস। বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমি দলীয় প্রার্থী হিসেবে এ আসনে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে প্রায় এক লাখ ভোট পেয়েছিলাম। যা জেলায় বিএনপির অন্যান্য প্রার্থীদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

এ ব্যাপারে সাবেক দুবারের সংসদ সদস্য সংস্কারপন্থী নেতা নজির হোসেন জানান, দলীয় সভানেত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে এলাকায় কাজ করছি। দুবার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। তাহিরপুরের তিনটি শুল্কস্টেশন আমার প্রচেষ্টায় চালু হয়েছিল বর্তমানে এগুলো বন্ধ রয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক ও ব্যবসায়ী বেকার হয়ে গেছে। আমি যদি দলীয় মনোনয়ন পাই এবং জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে তাহলে বন্ধ শুল্কস্টেশনগুলো চালুর বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখব। আশা করি জনগণ অতীতের ন্যায় আবারও ভোট দিয়ে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করবে।

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: