প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / বিস্তারিত

For Advertisement

750px X 80px Call : +8801911140321

প্রীতিলতার আত্মাহুতি : অপরাজেয় বাঙালির বোধের শক্তিকেন্দ্র

কারেন্ট নিউজ বিডি   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪:৩১:২৬

ঢাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর, কারেন্ট নিউজ বিডি : হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি বারবার পরাধীনতার শিকলে বন্দি হয়েছে। শোষণ–বঞ্চনার নাগপাশ থেকে মুক্তির প্রয়াস করেছে, করেছে তাদের বিদ্রোহী। তারুণ্যের আত্মত্যাগ আর সুগভীর চৈতন্যের মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছে বাঙালির ইতিহাস। কত রক্ত ঝরেছে, কত প্রাণ বলি হয়েছে মুক্তির সিঁড়িপথে। ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু এই বাংলা। আর বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল যাকে বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র বলতে সেই চট্টগ্রাম আজও বয়ে চলেছে ইতিহাসের গৌরবগাঁথা। একঝাঁক তারুণ্যের হাতে নির্মিত দেশপ্রেমের ও বিপ্লবের মহা সঞ্জীবনী শক্তি আজও প্রেরণা যোগায় সকল অত্যাচার অবিচারের। প্রত্যেক বিপ্লবীর জীবনকর্ম নিংড়ে আমরা সমৃদ্ধ হই, হই গর্বিত, পাই মাথা উঁচু করে বাঁচার শিক্ষা। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তেমনই একজন যাঁর অবদান শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয় এই সময় ও সমাজের প্রতিটি শুভ প্রতিরোধ–সংগ্রামে প্রবাহিত। আজ আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি তিনি একজন বাঙালি, যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী নারী শহীদ ব্যক্তিত্ব।

১৯১১ সালের ৫ই মে মঙ্গলবার চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই বিপ্লবী মহীয়সী। তাঁর পিতা মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানী জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার এবং মাতা প্রতিভাদেবী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে প্রীতিলতা দ্বিতীয়। যদিও পরিবারের আদি পদবী ছিল দাশগুপ্ত, কিন্তু বংশের কোনো এক পূর্বপুরুষ নবাবী আমলে “ওয়াহেদেদার” উপাধি পাওয়ার পর থেকেই এই ওয়াহেদেদার থেকে ওয়াদ্দেদার বা ওয়াদ্দার উপাধি যুক্ত হতে থাকে তাদের বংশে। শৈশবে পিতার মৃত্যুর পর জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার তাঁর পৈতৃক বাড়ি ডেঙ্গাপাড়া সপরিবারে ত্যাগ করেন। পটিয়া থানার ধলঘাট গ্রামে মামার বাড়িতেই বড়ো হন এবং এই বাড়িতেই মায়ের আদরের “রাণী” প্রীতিলতার জন্ম হয়। পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম শহরের আসকার খানের দীঘির দক্ষিণ–পশ্চিম পাড়ে টিনের ছাউনি দেওয়া মাটির একটা দোতলা বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে ওয়াদ্দেদার পরিবার।

For Advertisement

750px X 80px
Call : +8801911140321

প্রীতিলতা পড়াশোনার হাতেখড়ি মা–বাবার কাছে। তার স্মৃতিশক্তি ছিলো অসাধারণ। জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে ড. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান তিনি। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। অঙ্কের নম্বর খারাপ ছিল বলে তিনি বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হন। ১৯৩০ সালে আই.এ. পরীক্ষায় ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করে। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান। কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে তিনি বিএ পাস করেন। কিন্তু, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সাথে স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তাঁর সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয় ( অবশেষে তাঁদেরকে ২২ মার্চ, ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয়।) বিএ পাস করার পর চট্টগ্রাম অপর্ণাচরণ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

ব্রিটিশদের দুঃশাসনে কৈশোরেই প্রীতিলতার মনে বিপ্লবের বীজ বপিত হয়। ১৯২৩–এর ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাস এর মোড়ে সূর্য সেনের বিপ্লবী সংগঠনের সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাবদ নিয়ে যাওয়া ১৭,০০০ টাকা ছিনতাই করেন। এর দুই সপ্তাহ পর গোপন বৈঠক চলাকালীন অবস্থায় বিপ্লবীদের আস্তানায় হানা দিলে পুলিশের সাথে যুদ্ধের পর গ্রেফতার হন সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় রেলওয়ে ডাকাতি মামলা। এই ঘটনা কিশোরী প্রীতিলতার মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ঊষাদির সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই মামলার ব্যাপারে বিস্তারিত ভাবে অনেক কিছুই জানতে পারেন তিনি। ঊষাদির দেয়া “ঝাঁসীর রাণী” বইটি পড়ার সময় ঝাঁসীর রাণী লক্ষীবাইয়ের জীবনী তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রাণী লক্ষীবাই এর ইংরেজ সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস তাঁকে উজ্জীবিত করে। স্কুলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন কল্পনা দত্ত (পরবর্তীকালে বিপ্লবী)। এক ক্লাসের বড় প্রীতিলতা কল্পনার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। তাঁদের স্বপ্নের কথা লিখেছেন কল্পনা দত্ত “কোনো কোনো সময় আমরা স্বপ্ন দেখতাম বড় বিজ্ঞানী হব। সেই সময়ে ঝাঁসীর রানী আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। নিজেদেরকে আমরা অকুতোভয় বিপ্লবী হিসাবে দেখা শুরু করলাম। প্রীতিলতার নিকট–আত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার তখন বিপ্লবী দলের কর্মী। তিনি সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই দশম শ্রেণীর ছাত্রী প্রীতিলতার কাছে রাখেন। আর প্রীতিলতা লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েন “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম” আর “কানাইলাল” । ধারণ করতে থাকেন বিপ্লবীদের উন্নত ত্যাগময় আদর্শ। ইডেন কলেজে পড়ার সময় শিক্ষক নীলিমাদির মাধ্যমে লীলা রায়ের সাথে প্রীতিলতার পরিচয় হয়েছিল। তাঁদের অনুপ্রেরণায় দীপালী সঙ্গে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

পূর্ণেন্দু দস্তিদারের বদৌলতে কলকাতা বেথুন কলেজে পড়ার সময় তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিপ্লবীর সান্নিধ্যলাভ করেন। এর মধ্যে মনোরঞ্জন রায়, রামকৃষ্ণ বিশ্বাস অন্যতম। কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে এক পর্যায়ে তিনি মাস্টারদার বিপ্লবী দলে যোগ দেন। এখানে সঙ্গী হন আরো বিপ্লবী নরনারী। এরপর ধলঘাট গ্রামে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে অবস্থানকালে আগ্নেয়াস্ত্র triggering এবং targeting-এর উপর প্রীতিলতা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ধলঘাটের সাবিত্রী দেবী বিপ্লবীদের এক পরম আশ্রয় ছিলেন। বিপ্লবী নির্মল সেনের সাথে প্রথম সাক্ষাতে নির্মল সেন প্রীতিলতাকে পরিবারের প্রতি কেমন টান আছে তা জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে প্রীতিলতা বলেছিলেন “টান আছে। কিন্তু duty to family-কে duty to country-এর কাছে বলি দিতে পারব”। সত্যিই তাঁর কাছে পরিবারের জায়গায় দেশ শব্দটি মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এরপর তিনি সকল কর্তব্যের ঊর্ধ্বে দেশকে স্থান দিয়েছিলেন। এবং তাঁর উপর অর্পিত বিপ্লবী দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বেশ সাফল্যের সাথেই করছিলেন। নারী হওয়ায় ব্রিটিশদের নজরদারীর বাইরে থাকতেও পেরেছিলেন। ধলঘাট সংঘর্ষের পর সে সুযোগটিও থাকেনি। ব্রিটিশদের সন্দেহের তালিকায় তাঁর নাম উঠে যায়। তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর ছবিসহ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পুলিশ। মাস্টারদার নির্দেশে তিনি চলে যান আত্মগোপনে।

চট্টগ্রাম শহরের উত্তরদিকে পাহাড়তলী স্টেশনের কাছে এই ক্লাব ছিল ব্রিটিশদের প্রমোদকেন্দ্র। পাহাড় ঘেরা এই ক্লাবের চতুর্দিকে প্রহরীদের অবস্থান ছিল। একমাত্র শ্বেতাঙ্গরা ব্যতীত এবং ক্লাবের কর্মচারী, বয়–বেয়ারা, দারোয়ান ছাড়া এদেশীয় কেউ ঐ ক্লাবের ধারে কাছে যেতে পারতো না। ক্লাবের সামনের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল “ডগ এন্ড ইন্ডিয়ান প্রহিবিটেড”। সন্ধ্যা হতেই ইংরেজরা এই ক্লাবে এসে মদ খেয়ে নাচ, গান এবং আনন্দ উল্লাস করতো। বিপ্লবীদের কাছে এই ক্লাবটি লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল অনেক আগেই। যুববিদ্রোহের সময়ই আক্রমণ করার কথা ছিল।

১৯৩২ এর ১০ আগস্ট ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দিন ধার্য করা হয়। শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সাতজনের একটা দল সেদিন ক্লাব আক্রমণ করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। শৈলেশ্বর চক্রবর্তী পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

মাস্টারদা ১৯৩২ এর সেপ্টেম্বর মাসে ক্লাবে হামলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই আক্রমণের দায়িত্ব তিনি নারী বিপ্লবীদের উপর দেবেন বলেন মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু সাতদিন আগেই পুলিশের হাতে পুরুষবেশী কল্পনা দত্ত ধরা পড়ে গেলে আক্রমণে নেতৃত্বের ভার পড়ে একমাত্র নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার ওপর। ২৩ সেপ্টেম্বর এ আক্রমণে প্রীতিলতার পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকা দেবার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি, পায়ে রবার সোলের জুতা। ইউরোপীয় ক্লাবের পাশেই ছিল পাঞ্জাবীদের কোয়ার্টার। এর পাশ দিয়ে যেতে হবে বলেই প্রীতিলতাকে পাঞ্জাবী ছেলেদের মত পোশাক পরানো হয়েছিল। আক্রমণে অংশ নেয়া কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী পোশাক ছিল ধুতি আর শার্ট। লুঙ্গি আর শার্ট পরনে ছিল মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে আর পান্না সেন এর।

বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা যোগেশ মজুমদার (বিপ্লবীদের দেয়া তাঁর গোপন নাম ছিল জয়দ্রথ) ক্লাবের ভিতর থেকে রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে আক্রমণের নিশানা দেখানোর পরেই ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। সেদিন ছিল শনিবার, প্রায় চল্লিশজন মানুষ তখন ক্লাবঘরে অবস্থান করছিল। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন । প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ক্লাব কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ক্লাবঘরের সব বাতি নিভে যাবার কারণে সবাই অন্ধকারে ছুটোছুটি করতে লাগল। ক্লাবে কয়েকজন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার ছিল। তাঁরা পাল্টা আক্রমণ করল। একজন মিলিটারী অফিসারের রিভলবারের গুলিতে প্রীতিলতার বাঁ–পাশে গুলির আঘাত লাগে। প্রীতিলতার নির্দেশে আক্রমণ শেষ হলে বিপ্লবী দলটার সাথে তিনি কিছুদূর এগিয়ে আসেন। পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী সেদিনের এই আক্রমণে মিসেস সুলিভান নামে একজন নিহত হয় এবং চারজন পুরুষ এবং সাত জন নারী আহত হয়।

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ শেষে পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে দেন। কালীকিংকর দে’র কাছে তিনি তাঁর রিভলবারটা দিয়ে আরো পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলে, কালীকিংকর তা প্রীতিলতার মুখের মধ্যে ঢেলে দেন। পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া প্রীতিলতাকে বিপ্লবী শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাই স্থান ত্যাগ করেন।

(দৈনিক আজাদী থেকে সংগৃহীত)

লেখক : প্রকৌশলী পুলক কান্তি বড়ুয়া, আহবায়ক, বাংলাদেশ বাঙালি মূলনিবাসী ইউনিয়ন।

For Advertisement

750px X 80px Call : +8801911140321

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: