প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / বিস্তারিত

For Advertisement

750px X 80px Call : +8801911140321

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন জরুরি

কারেন্ট নিউজ বিডি   ৪ অক্টোবর ২০১৮, ৩:৪৭:০৪

প্রাথমিক শিক্ষা শিশুর সামাজিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বুনিয়াদি শিক্ষা নিশ্চিত করে তাকে আগামী দিনের কান্ডারি হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়। তাই এই শিক্ষাকে মানুষ গড়ার আঁতুড়ঘর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশুকে ভবিষ্যতের দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা হলো প্রথম ও প্রধান সোপান। এই শিক্ষা প্রতিটি শিশুর সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ, আনন্দময় বর্তমান, সৃজনশীল ভবিষ্যৎ ও প্রগতিশীল উৎপাদনমুখর উন্নত সমাজ বিনির্মাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে, শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, মানবিক, নান্দনিক, নৈতিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্মবোধে, বিজ্ঞানমনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা।

প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের শিশুরা ঊনত্রিশটি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করতে সমর্থ হবে এমনভাবেই আমাদের শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে কতটুকু অর্জন করতে আমরা সমর্থ হচ্ছি সেটাই হচ্ছে দেখার বিষয়। একটা কথা স্বীকার করতেই হবে আমাদের দেশ প্রাথমিক শিক্ষার দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশংসনীয় উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, এ দেশের সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষিত করতে না পারলে দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করা যাবে না। তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও দুঃসাহসী পদক্ষেপ হিসেবে তিনি ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। প্রায় দেড় লাখ শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণ করেন।

For Advertisement

750px X 80px
Call : +8801911140321

শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করার জন্য বিনামূল্যে খাতা, পেন্সিল, জামা-কাপড়, দুধ, ছাতু ইত্যাদি সরবরাহের উদ্যোগ নেন। বিদ্যালয় গৃহনির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেন টিন। ড. কুদরত-ই-খুদা কমিশনের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিস্তৃত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁর সেসব উদ্যোগ পঁচাত্তরের পর থমকে যায়। প্রাথমিক শিক্ষায় নেমে আসে অন্ধকার।

দীর্ঘ অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাথমিক শিক্ষায় আশার আলো জ্বালিয়েছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি প্রাথমিকের উন্নয়নে পিতার পদাঙ্কই অনুসরণ করে চলেছেন। ইতিমধ্যে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছেন। লক্ষাধিক শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের জন্য নিয়েছেন নানামুখী পদক্ষেপ। শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই রঙিন বই তুলে দেওয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, অনগ্রসর এলাকায় স্কুল ফিডিং চালু, দফতরি-কাম-প্রহরী নিয়োগ, স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু, স্কুল শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টিসহ লক্ষাধিক শিক্ষক নিয়োগ ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, প্রধান শিক্ষকের মর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীতকরণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা-উপকরণ সরবরাহসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি) চলে আসছে। গত জুলাই থেকে চলছে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হচ্ছে ২৫ হাজার ৫৯১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আর বাকি ১২ হাজার ৮০৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আসছে বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে। এই প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৭৪ জন শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। গুরুত্ব পাচ্ছে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এবং এমনকি প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও। এই কর্মসূচির আওতায় প্রদান করা হবে শিক্ষা-উপকরণ। শ্রেণিকক্ষ সংকট প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বড় বাধা। এটি দূর করতে প্রকল্পটির আওতায় ৪০ হাজার অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করার পরিকল্পনা আছে। আছে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহের পরিকল্পনা।

সরকার প্রাথমিক শিক্ষার সংখ্যাগত ও গুণগত মান উন্নয়নের জন্য এত উদ্যোগ নিচ্ছে, তারপরও কাক্সিক্ষত মাত্রায় মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এর কারণ বহুবিদ। সরকার কর্তৃক অনেক ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলো চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়। এখনো পত্রিকার পাতায় সংবাদ হয় এক ঘরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা, আধা কোমরে ডুবে থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা। অনেক বিদ্যালয়ে ক্লাসরুমের অভাবে পাঠদান হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে, কোথাও কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। অনেক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই। নেই শিক্ষণ-শিখনের কাক্সিক্ষত পরিবেশ।

সমৃদ্ধ ও উন্নত আগামী বিনির্মাণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য প্রাথমিকের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান অতি জরুরি। শিক্ষকদের দক্ষতাজনিত যেসব ঘাটতি আছে, তা দূরীকরণের জন্য প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জ্ঞান যেন শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করে সেজন্য তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকরা যেন পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করে আধুনিক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতিতে আনন্দদায়ক শিখন পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠদান করে সেদিকে নজর দিতে হবে। সঠিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি আছে সেসব প্রতিষ্ঠানের দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যেন অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক না হয়, সেদিকে বিশেষ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

শিশুদের শিখন-শেখানোর পরিবেশকে আনন্দ-মুখর ও শিশু-বান্ধব করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। শ্রেণিকক্ষে রঙিন কাগজে চারু ও কারুকলার কাজ সুন্দরভাবে টানিয়ে স্বল্পব্যয়ে শিশু-শিক্ষার্থীদের কাছে শ্রেণিকক্ষকে চিত্তাকর্ষক করা প্রয়োজন। খেলার মাঠ, খেলাধুলার সামগ্রীর ব্যবস্থা করতে হবে।

লেখক : বাহালুল মজনুন চুন্নূ,  সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাবি।

For Advertisement

750px X 80px Call : +8801911140321

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: