For Advertisement

750px X 80px Call : +8801911140321

যৌনদাসী থেকে নোবেলজয়ী নাদিয়া

কারেন্ট নিউজ বিডি   ৬ অক্টোবর ২০১৮, ৪:১৫:৪২

নাম নাদিয়া মুরাদ, বয়স মাত্র ২৫। এরই মধ্যে তিনি দেখে ফেলেছেন জীবনের নৃশংস রূপ। জঙ্গিদের যৌনদাসী হয়ে বন্দি জীবন কাটিয়েছেন, পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছে, শাস্তিস্বরূপ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ফের প্রাণ হারানোর ঝুঁকি নিয়ে পালিয়েছেন সেখান থেকে। ফিরে এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন তার মতো হাজারো নির্যাতিতা নারীদের। পেয়েছেন বিশ্ববাসীর ভালবাসা আর সম্মান, যার সর্বশেষ প্রাপ্তি এ বছর যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল জয়।

পাকিস্তানের নারী শিক্ষা অধিকার কর্মী মালালা ইউসুফ জাইয়ের পর সবচেয়ে কমবয়সী হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানজনক এই পুরস্কার জিতলেন ইয়াজিদি এই তরুণী।

For Advertisement

750px X 80px
Call : +8801911140321

ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় ছোট্ট গ্রাম কোচোতে পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন নাদিয়া মুরাদ। দারিদ্র্যের মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৪ সালে ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী (আইএস) ঢুকে পড়ে ওই গ্রামে। একদিন গ্রামের সবাইকে অস্ত্রের মুখে একটি স্কুলে ঢোকানো হয়। পুরুষদের আলাদা করে স্কুলের বাইরে দাঁড় করানো হয়। এর পরেই মুহুর্মুহু গুলিতে নাদিয়ার ছয় ভাইসহ পুরুষদের হত্যা করা হয়।

পুরুষদের হত্যা করার পর আইএস জঙ্গিরা নাদিয়া ও অন্য নারীদের একটি বাসে করে মসুল শহরে নিয়ে যায়। সেখানে অল্প বয়সী মেয়েদের যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করা হয়। বিক্রি হন নাদিয়াও। আইএসের যৌনদাসী হিসেবে বেশ কিছুদিন থাকার পর পালিয়ে আসেন তিনি।

এক সাক্ষাৎকারে নিজেই এই লোমহর্ষক কাহিনি শুনিয়েছেন নাদিয়া মুরাদ। ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ শিরোনামে নাদিয়ার একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। ওই বইয়ে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

আইএসের কাছ থেকে পালিয়ে আসার পর নাদিয়া মুরাদ জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হয়েছেন। মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী আমাল ক্লুনির সঙ্গে আইএস জঙ্গিদের হাতে বন্দী ইয়াজিদি নারী ও যাঁরা পালিয়ে এসেছেন, তাঁদের নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

নাদিয়া মুরাদ বলেন, ‘আমাদের গ্রামের সবাই গরিব। কিন্তু এতেই সবাই সন্তুষ্ট ছিলেন, সুখী ছিলেন। ২০১৪ সালে আমাদের গ্রামে ঢোকে আইএস। তাঁরা অন্য পুরুষদের সঙ্গে আমার ছয় ভাইকে গুলি করে হত্যা করে। পরে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশী নারীদের সঙ্গে আমাকেও বাসে মসুল শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। বাসে যাওয়ার সময় আইএসের জঙ্গিরা নারীদের শ্লীলতাহানি ও যৌন হয়রানি করে।’

আইএসের হাত থেকে পালিয়ে আসা এই তরুণী বলেন, বাস থেকে নামিয়ে যৌনদাসী হিসেবে তাঁদের বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এক ব্যক্তি দেখেশুনে তিনজন নারীকে পছন্দ করে। পরে মার্কিন ডলার দিয়ে তাঁদের কিনে নিয়ে যায়। আরেক ব্যক্তি নাদিয়ার পেটে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয়। এর অর্থ নাদিয়াকে কেনার জন্য পছন্দ করেছে ওই ব্যক্তি। পরে ওই ব্যক্তি তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়।

নাদিয়া বলেন, ‘সব সময় এই বেদনাদায়ক গল্প বলতে আমার ভালো লাগে না। এ কারণেই এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ আমি বইয়ে লিখেছি।’ তিনি বলেন, আইএস জঙ্গিরা ইয়াজিদি নারী, তরুণী এমনকি নয় বছর বয়সী কন্যাশিশুকেও যৌন নির্যাতন করতে ছাড়ে না। তাঁদের অপহরণের শিকার অনেক ইয়াজিদি নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।

যৌনদাসী হিসেবে থাকার পর একদিন পালানোর চেষ্টা করেছিলেন নাদিয়া। কিন্তু ধরা পড়েন। আর পালানোর চেষ্টা করার শাস্তি হিসেবে তিনি গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন।

নাদিয়া বলেন, ‘পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েও আমি ভেঙে পড়িনি। কারণ হাজারো নারী আইএসের হাতের বন্দী আছেন। এ ভাবনাই আমাকে সাহস দিয়েছিল।’

যৌন নির্যাতনের শিকার নাদিয়া আইএসের হাত থেকে পালানোর জন্য তক্কেতক্কে ছিলেন। একদিন দরজা বন্ধ না করেই নাদিয়াকে একা ঘরে রেখে বেরিয়ে গিয়েছিল এক আইএস সদস্য। ব্যস, এই সুযোগেই ঘর থেকে বেরিয়ে দেয়াল টপকে আইএসের ডেরা থেকে বেরিয়ে যান তিনি। কাপড়ে মুখ ঢেকে মসুলের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় চান। পরে ওই বাড়ির সদস্যরা সাহায্য করেন। তাঁরাই একজনের স্ত্রী সাজিয়ে নাদিয়াকে আইএসের এলাকা থেকে বের করে দেন। পরে ২০১৫ সালে জার্মানির শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় মেলে। সেখানে তাঁর এক বোনও আছেন। ওই বোনের স্বামীকে জঙ্গিরা হত্যা করেছে। জার্মানির স্টুটগার্টের একটি অ্যাপার্টমেন্টে এখন তিনি বোনসহ থাকেন।

নাদিয়া বলেন, ‘এটা ঠিক সাহসের বিষয় নয়। আপনি যখন প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হবেন, নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়াবেন, তখন এসব ভাবনাই আপনাকে টিকে থাকার উপায় বের করে দেবে।’

নাদিয়া আরও বলেন, ‘মসুলে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাস করেন। তাঁদের মধ্যে দুই হাজার মেয়েকে অপহরণ করে আটকে রেখেছে জঙ্গিরা। মসুলে হাজারো পরিবার বাস করেন কিন্তু কেউই সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। যাঁরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা হাজার হাজার ডলার দাবি করেছিলেন।’ নাদিয়ার ভাবিকে উদ্ধারে ওই ভাবির পরিবার ২০ হাজার ডলার দিয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আইএসের হাত থেকে পালিয়ে আসার পর একবার নিজের গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন নাদিয়া। কিন্তু সেখানে গিয়ে আর বাড়ি খুঁজে পাননি তিনি। পুরো বাড়ি, পুরো গ্রাম যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে।

‘দ্য লাস্ট গার্ল’ বইয়ের লেখক নাদিয়া মুরাদ বলেন, ‘আমাদের ধারণা ছিল, অন্য পুরুষ সদস্যদের মতোই আমাদের হত্যা করা হতে পারে। কিন্তু আমাদের হত্যা করা হয়নি। এর বদলে ইউরোপ, সৌদি আরব ও তিউনিসিয়া থেকে আসা জঙ্গিরা রোজ একের পর এক এসে আমাদের ধর্ষণ করে যেত।’ তিনি আরও বলেন, তিনি একজন মেকআপ আর্টিস্ট হতে চান। নিজের একটা স্যালন খুলতে চান। নতুন করে জীবন শুরু করতে চান। তিনি আইএসের হাত থেকে বেঁচে পালিয়ে আসা তরুণী হিসেবে পরিচিতি পেতে চান না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ মানবাধিকারবিষয়ক পুরস্কার শাখারভ পুরস্কার-২০১৬ পেয়েছেন ইয়াজিদি নারী নাদিয়া মুরাদ। আর আজ জিতলেন বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সম্মানজনক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার।

For Advertisement

750px X 80px Call : +8801911140321

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: