মাদক ব্যবসায়ীদের স্বস্তিতে থাকতে দেবো না: জামাল উদ্দীন

১০ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৪০:৪৬

সর্বনাশা মাদক ভেতরে ভেতরে পুরো প্রজন্মকে শেষ করে দিচ্ছে। শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জে, অলিতে-গলিতে চলছে মাদকের কেন-বেচা। স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরাও এখন মাদকের ছোবলে দিশেহারা। সর্বগ্রাসী মাদক থেকে দেশকে মুক্ত করতে গঠন করা হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তারা নিয়মিতই মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান পরিচালনা করছেন। কাজ করছেন সারাদেশ ব্যাপী। তাদের হাতেই প্রথম ধরা পড়ে ‘খাত’ নামক নতুন মাদক।

সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সম্প্রতি একটি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ। তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণ, অভিযান, অধিদপ্তরের কার্যক্রম ও নতুন মাদক ‘খাত’ নিয়ে কথা বলেছেন।

সাংবাদিক: নতুন মাদক ‘খাত’ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, এদেশে এর বিস্তার সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

জামাল উদ্দীন আহমেদ: আমাদের দেশে নতুন মাদক ‘খাত’ এর আবির্ভাব ঘটেছে। আমাদের অভিযানেই প্রথম ধরা পড়ে এই মাদক। গত ৩১ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এর বৈদেশিক ডাক বিভাগের অফিস ও কাস্টমস এর কার্গো সার্ভিস এলাকায় গোয়েন্দা শাখার একটি বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে এর চালান জব্দ করে। এর আগে এই মাদক সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।

সাংবাদিক: বাংলাদেশের মানুষ কী এই মাদকে আসক্ত?

জামাল উদ্দীন আহমেদ: এই বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। আমাদের গবেষণা চলছে। তবে এ ধরণের মাদক পৃথিবীর অনেক দেশেই ব্যবহৃত হয়। আমরা যেটুকু জানি মাদককারবারীরা আমাদের দেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। মূলত আমাদের দেশে এর ব্যবহার তেমন একটা নেই। ইথিওপিয়া থেকে এই মাদকগুলো মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করছে। রুট হিসেবে আমাদের দেশকে তারা ব্যবহার করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এই প্রথম বড় ধরণের চালান আটক করে। এরপর চট্টগ্রামেও অভিযান চালিয়ে এই মাদক জব্দ করা হয়। নিয়মিত অভিযান এর ফলে সবাই এখন এই মাদক সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে।

সাংবাদিক: নতুন মাদক ‘খাত’ কী আমাদের দেশে নিষিদ্ধ?

জামাল উদ্দীন আহমেদ: পৃথিবীর অনেক দেশেই এই মাদক নিষিদ্ধের তালিকায় উঠে এসেছে। আমাদের দেশেও এই মাদক নিষিদ্ধ না হলেও নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া চলছে। পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলছে। এনপিএস নতুন মাদক হওয়ায় আমাদের তালিকাভুক্ত নয়। তাই এটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ইতোমধ্যে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে। তবে নিষিদ্ধের ঘোষণাপত্র এখনো আমাদের হাতে পৌঁছায়নি। আশা করছি শিগগিরই এটি আমরা পাব।

সাংবাদিক: আপনারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন, এর মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণে কতটুকু সফল মনে করছেন?

জামাল উদ্দীন আহমেদ: আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি। এর মাধ্যমে দেশে মাদকব্যবহারকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। ধীরে ধীরে মাদক এর ব্যবহার কমে আসছে। যারা মাদকের ব্যবসা করছে তাদেরকে আমরা স্বস্তীতে থাকতে দেবো না। মাদক নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এ অভিযান চলবে। যেমন গত ২০-২৬ সেপ্টেম্বর সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে আমরা ২৪৭৮টি সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছি। ৬০৩জন আসামীর বিরুদ্ধে ৫৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সময় ৫৯ হাজার ৫০৬ পিস ইয়াবাসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। এ বিশেষ অভিযানে র‌্যাব, পুলিশ, আনসার, এপিবিন, বিজিবি, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা সংস্থাসহ সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

সাংবাদিক: মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ রয়েছে যে আপনাদের অনেকেই মাদক কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত। এ সম্পর্কে কী বলবেন?

জামাল উদ্দীন আহমেদ: মাদক ব্যবসার সঙ্গে অধিদপ্তরের কেউ জড়িত থাকতে পারে না। আমার কর্মীদের মধ্যে কেউ যদি জড়িত থাকে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। যাদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমানসহ অভিযোগ পাওয়া গেছে এরকম কয়েকজনকে আমরা জেলেও পাঠিয়েছি। সুতরাং সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।

সাংবাদিক: মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ রয়েছে যে তাদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষমতা যা তার থেকে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি করছে। এক রকম ব্যবসা চলছে, এ বিষয়ে কী বলবেন?

জামাল উদ্দীন আহমেদ: আমরা নতুন মাদকনিয়ন্ত্রণ আইন করার চেষ্টা করছি। শিগগিরই এটি পাশ হবে; প্রক্রিয়া চলছে। তখন অনেক সমস্যাই কেটে যাবে। একটা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একজন ডাক্তার ৩০ জন পর্যন্ত রোগী দেখতে পারে। এর বেশি দেখা ঠিক না। কিন্তু এসব নিয়ম অনেক ক্ষেত্রে নানা কারণে পালন করা হয়ত যাচ্ছে না। আগামীতে এসব থাকবে না। আরেকটি বিষয়, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের শয্যা সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ তে উন্নীত করা হয়েছে। আগামীতে এর বেড় সংখ্যা ২৫০ করার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া ৩টি বিভাগীয় নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা ৫ থেকে ২৫ উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। গত এক বছরে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা ১৮২ হতে ২৬৫ তে উন্নীত করা হয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রীকভাবে আমরা চেষ্টা করছি মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য যা যা করা দরকার সবই। সরকার আমাদেরকে এক্ষেত্রে খুবই সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

সাংবাদিক: আপনাদের জনবল সংকট রয়েছে, তাহলে আপনারা কিভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন?

জামাল উদ্দীন আহমেদ: আমাদের জনবল কম এটা ঠিক তবে সকলের অংশ গ্রহণে আমরা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। পুলিশ, র‌্যাব সকল সংস্থা সহযোগিতা করছে।

সাংবাদিক: মাদক নিয়ন্ত্রণে গত এক বছরে আপনারা কী কী কাজ করেছেন? আগামী দিনের পরিকল্পনা কী?

জামাল উদ্দীন আহমেদ: আমরা গত এক বছরে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩০ হাজার ৮৯৭টি অভিযান পরিচালনা করেছি। ৯ হাজার ৩৩৪ জন অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের ৮ হাজার ৪০৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একটু পেছনের দিকে গিয়ে বলি আমাদের ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৪১টি অফিসের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হতো। বর্তমানে আমরা ৯৭টি অফিসের মাধ্যমে আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচিছ। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক বিরোধী সভা সমবেশ করেছি। ৩২ হাজার ৫৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ১৯১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক বিরোধী কমিটি করেছি। আমাদের গত ১ মার্চ ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে একযোগে এক কণ্ঠে সারাদেশে মাদককে না বলুন শ্লোগান প্রচারিত হয়েছে। এভাবে মাদকবিরোধী সভা সেমিনার, আলোচনা সভা, টিভিসি প্রচার করা হয়েছে।

সর্বশেষ বলবো, ৪ থেকে ৬ আক্টোবর দেশব্যাপি উন্নয়ন মেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমাদের অধিদপ্তর প্রতিটা জেলা উপজেলায় এ উন্নয়ন মেলায় অংশ গ্রহণ করবে। মাদকের বিরুদ্ধে সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, আমরাও করছি। উন্নয়ন মেলায় বিগত দিনের আমাদের কার্যক্রমকে মানুষের সামনে আমরা তুলে ধরতে চাই। সরকারের সাফল্যে তুলে ধরতে চাই। গতকালের বাংলাদেশের চেয়ে আজকের বাংলাদেশ আরও উন্নত এই শ্লোগানে এগিয়ে যেতে চাই।

সংগৃহিত

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: