প্রচ্ছদ / ময়মনসিংহ / বিস্তারিত

For Advertisement

750px X 80px Call : +8801911140321

৭১’ সালে জেলা পরিষদ বাংলো ও বাকৃবির রেস্টহাউস ছিল টর্চার সেল

কারেন্ট নিউজ বিডি   ৬ মার্চ ২০১৮, ১২:৩০:১১

একাত্তরে ময়মনসিংহে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদরদের প্রধান টর্চার সেল ও কিলিং সেন্টার ছিল মূলত দুটি। এগুলো হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র পাড়ের জেলা পরিষদের ডাকবাংলো এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) রেস্টহাউস। প্রত্যক্ষদর্শী অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম জানান, অবাঙালি কিলার গ্রুপ ও স্থানীয় রাজাকার, আলবদররা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বাঙালিদের ধরে এনে ডাকবাংলোয় গুলি চালিয়ে হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দিতো পেছনের ব্রহ্মপুত্র নদীতে। শেয়াল, কুকুর খেয়ে ফেলার পরও দেশ স্বাধীন হলে ব্রহ্মপুত্র পাড় ও চরজুড়ে পড়েছিল অগুনতি লাশ আর কঙ্কাল।

মুক্তিযুদ্ধের গবেষক মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল জানান, একাত্তরের ২২ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের পতন হলে ২৩ এপ্রিল শুক্রবার পাকসেনারা ঢুকে পড়ে। গঠন করা হয় শান্তি কমিটি। ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর সাইনবোর্ড সরিয়ে সেখানে মে মাসে ঝুলানো হয় জেলা শান্তি কমিটির কার্যালয়, মোমেনশাহীর সাইনবোর্ড। শান্তি কমিটির সাইনবোর্ড ঝুলানো হলেও এর নেপথ্যে ছিল মূলত ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত আলবদর বাহিনীর টর্চার সেল ও কিলিং সেন্টার। তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘ বৃহত্তর ময়মনসিংহের সভাপতি আশরাফ হোসেন (যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক), সহ-সভাপতি মজিবুর রহমান ঘাটাইল, সাধারণ সম্পাদক শেরপুরের কামারুজ্জামান (যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে), গৌরীপুরের অ্যাডভোকেট সারোয়ারসহ ১১ সদস্যের কমিটি ছিল জেলা পর্যায়ে। এই আলবদর বাহিনীর জন্ম হয়েছিল জামালপুরের আরামনগর মাদ্রাসায়। তাদের হেডকোয়ার্টার ছিল এই ডাকবাংলোয়।

For Advertisement

750px X 80px
Call : +8801911140321

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে আলবদর বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ডার ছিল পরবর্তী সময়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হওয়া কামারুজ্জামান। শহরের চকবাজার বড় মসজিদ ও সংলগ্ন মাদ্রাসা ছিল রাজাকারদের আস্তানা। বড় মসজিদের ইমাম ও শান্তি কমিটি প্রধান মাওলানা ফয়েজুর রহমানের পুত্র মৃত মফিজুর রহমান তৈয়ব ছিল অস্ত্রধারী রাজাকার কমান্ডার। তার সহযোগী ছিল রাইফেলধারী রফিক ও মানিক। অবাঙালি কিলার ইয়াসিন ও নজর আব্বাসসহ অস্ত্রধারী রাজাকাররা বাঙালিদের ধরে এনে তুলে দিতো আলবদর বাহিনীর হাতে। বর্তমান সরকারের মেয়াদে ডাকবাংলোর পেছনের এই বদ্ধভূমিটি চিহ্নিত করা হয়েছে।

একাত্তরে শহীদ রতন খন্দকারকে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদররা শহরের গাঙিনাপাড় ট্রাফিক মোড় থেকে ধরে নিয়ে যায় জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে। হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের পর হত্যা করে রতনের লাশ ফেলে দেয়া হয় ব্রহ্মপুত্র নদীতে। পরিবারের অন্য সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধেই রতনকে সেদিন ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। শহরের কাচিঝুলি এলাকা থেকে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদররা জেলা পরিষদের এই ডাকবাংলোয় ধরে নিয়ে যায় টেপা মিয়া ও শহীদ জহিরুল ইসলাম দারাকে। অনেকের সঙ্গে আটক টেপা মিয়া ও পুত্র দারাকে নির্যাতনের পর পেছনে দুই হাত বেঁধে রাতের বেলায় লাইনে দাঁড় করানো হয় গুলি করার জন্য। গুলির শব্দ শুনেই কিছুটা পেছনে থাকা টেপা মিয়া মাটিতে পড়ে যান। সেদিন দারা শহীদ হলেও লাশের স্তূপের নিচে পড়ে থাকা টেপা মিয়া কৌশলে ডাকবাংলোর পেছনের ভাঙা দেয়ালের নিচ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে লাফিয়ে পড়েন পেছনের ব্রহ্মপুত্রে। পরে সাঁতরিয়ে শহরের কাটাখালি এলাকার বাসিন্দা ও জেলা পরিষদের অবসরপ্রাপ্ত ওভারশিয়ার আব্দুর রহিমের বাসায় গিয়ে উঠে প্রাণ বাঁচান। শহীদ দারার ভাই সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, ময়মনসিংহ মুক্ত হওয়ার পর টেপা মিয়া পরনের লুঙ্গি দেখে ব্রহ্মপুত্র তীরে শহীদ দারার কঙ্কাল শনাক্ত করেন। শহীদ রতন, শহীদ দারা, শহরের চামড়াগুদাম এলাকার বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ শহীদ শাহেদ আলী, আকুয়া এলাকার শহীদ আনোয়ার হোসেন সুরুজসহ অসংখ্য বাঙালিকে ধরে নিয়ে ডাকবাংলোর ভেতরে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে এসব লাশ ফেলে দেয়া হয় ব্রহ্মপুত্র নদীতে।

শহরের মহারাজা রোডের মধু বাবুর গলি থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল জাফর মিয়াকে। আট দিন বন্দি থাকার পর অনেক চেষ্টার পর জাফরকে ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হন তার স্ত্রী রমিসা। তবে ছেড়ে দেওয়ার আগে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা জাফরের শরীর থেকে সিরিঞ্জ দিয়ে এক ব্যাগ রক্ত রেখে দেয়। ডা. এমএ হাসান সম্পাদিত ‘যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ’ বইতে এই কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে।

ডাকবাংলো ছাড়াও একাত্তরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্টহাউস ছিল পাক সেনাদের ৯৩ ব্রিগেড কমান্ডের হেডকোয়ার্টার। এই কমান্ডের কমান্ডার ইন চিফ ছিল ব্রিগেডিয়ার আব্দুল কাদির খান। লে. কর্নেল আফতাব আহমদ কোরেশী ছিল তার সহযোগী। এই কমান্ডের অধীন ৩১ বেলুচ জামালপুর ও শেরপুর নিয়ন্ত্রণ করতো। শহরের সার্কিট হাউসে ছিল জিসিও ৩৩ পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রেস্টহাউসে নির্মম নির্যাতনের শিকার ও এখানে বন্দিদশায় অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মুকুল নিকেতন স্কুলের রেক্টর অধ্যাপক আমির আহমদ চৌধুরী রতন। তিনি জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে বাঙালিদের ধরে এনে এখানে হাত, পা ও চোখ বেঁধে নির্যাতনের পর কখনও বন্দুকের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, কখন ব্লেড-চাকু দিয়ে কাটাছেঁড়া করে আধমরা করার পর গুলি চালিয়ে হত্যা করা হতো। পরে এসব লাশ ফেলে কিংবা ভাসিয়ে দেওয়া হতো রেস্টহাউসের পেছনে ব্রহ্মপুত্র নদীতে।

চোখের সামনেই হাবিলদার আলাউদ্দিন চাকু দিয়ে হত্যা করে ভালুকা থেকে ধরে আনা আব্দুল হেকিমকে। এমন ১০টি হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছিলেন রতন। এসবের বাইরে সেখানে বন্দি অনেক নারীর কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক বিমল পাল জানান, একাত্তরে ডাকবাংলো ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুটি টর্চার সেল ও কিলিং সেন্টারে কতজনকে হত্যা করা হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে ধারণা করা হয়, পাঁচ শতাধিক বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. শাহ মোহাম্মদ ফারুকের উদ্যোগে রেস্ট হাউসের পেছনের বধ্যভূমিটি শনাক্ত ও চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে বর্তমান সরকার মেয়াদে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতৃত্বে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্টহাউস, ডাকবাংলো, সার্কিট হাউস সংলগ্ন পার্কের বধ্যভূমিসহ কয়েকটি বধ্যভূমি শনাক্ত করে সংরক্ষণ করা হয়।

For Advertisement

750px X 80px Call : +8801911140321

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: