সংকটে সম্ভাবনায় জবির ১৪ বছরে পদার্পণ

২০ অক্টোবর ২০১৮, ৩:০৮:০০

শিকড় থেকে শিখড়ের দেশের অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। ২০ অক্টোবর পূর্ণ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার ১৩তম বছর। পা দিচ্ছি ১৪তম বছরে। এই দীর্ঘ পথচলায় বিভিন্ন সংকট সমস্যায় জর্জরিত দেশের প্রাচীন এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। এ দীর্ঘ সময়ে বলার মতো অনেক সাফল্য থাকলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়নি। এতে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী।

দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ভর্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ভর্তি হলেও তারা পাচ্ছেন না তেমন সুযোগ-সুবিধা। কাগজে কলমে আবাসিক হলেও বাস্তবে অনাবাসিক এই বিদ্যাপীঠটির প্রকট আবাসন সমস্যার সঙ্গে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিবহন সমস্যা, শ্রেণিকক্ষ সংকট, ক্যাফেটেরিয়া সমস্যা, গ্রন্থাগার সমস্যা, সেমিনার সমস্যাসহ নানান সমস্যা।

খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। একমাত্র খেলার মাঠ ধূপখোলা মাঠ, যা খেলার অনুপযোগী। এতে শিক্ষার্থীদের অনেকেই মনে করছেন নামে বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সুযোগ-সুবিধাই পাচ্ছেন না তারা। বিভিন্ন সমস্যা সমধানের জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না তারা। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এসব সমস্যা সমাধান না হওয়ায় অনেকে এটাকে দেখছেন ‘বাৎসরিক সমস্যা’ হিসেবে। কেননা সমস্যা আর সংকট থেকেই বছরব্যাপী যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে ১২টি হল থাকলেও বর্তমানে সেগুলো বেদখল হয়ে আছে। নামেমাত্র কিছু দখলে থাকলেও সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগের অভাবে তৈরি হয়নি কোনো ভবন। বাণী ভবন নামের একটি হলের এক অংশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা থাকেন।

এ ছাড়া সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলে ২৩ জন শিক্ষার্থী থাকেন বলে জানা যায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের দেখাশোনা করে না বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। সেই হলের দায়িত্বে আছেন অছাত্ররা।

হাবিবুর রহমান হলে কর্মচারী থাকলেও ভবন করার তাগাদা নেই প্রশাসনের। আবাসিক সুবিধা না থাকার কারণে ছাত্রছাত্রীদের অনেক টাকা ব্যয়ে বাইরে থাকতে হয়। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য যে পরিবহণ বাস আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বাসে বাঁদর ঝোলা হয়েও জায়গা পান না বলে অভিযোগ যাতায়াতকারীদের।

অনির্বাণ বাসের এক শিক্ষার্থী বলেন, ফার্মগেট থেকে প্রতিদিন দাঁড়িয়েও বাসের ভিতর জায়গা পাওয়া যায় না। যদি একাধিক বাস থাকত তবে অন্তত যাওয়ার মতো জায়গা পাওয়া যেত। এতে বাধ্য হয়ে পাবলিক বাসে করে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুল থেকে জানা যায়, শিক্ষার্থীর জন্য বাস বরাদ্দ মাত্র ১৬টি। ১৬টি বাসে প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থী বহন করতে সক্ষম। ফলে ১৭ হাজার শিক্ষার্থীই পরিবহন সেবার বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতকরা ১০ ভাগ শিক্ষার্থী পরিবহন সুবিধা পাচ্ছেন। আর বাকি ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী এই পরিবহন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র একটি, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এখানে শ্রেণিকক্ষের সংকট অনেক বেশি। এক ব্যাচ ক্লাস করলে অন্য ব্যাচ ক্লাসের অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার শ্রেণিকক্ষ এমন যে সেখানে বসার জায়গা থাকে না। বিভাগীয় কমনরুমও নেই ছাত্রীদের। দু-একটি বিভাগে থাকলেও তাতে ছাত্রীদের বসার জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব নেই। পরীক্ষা থাকলে অন্যরা ক্লাস করতে পারেন না। বিগত ১৩ বছরে হয়নি একটি সমাবর্তনও।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু ২০০৫ সালের তৎকালীন জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হলেও অদ্যাবধি কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর অনীহার কারণে আজও কোনো সমাবর্তন হচ্ছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩টি ব্যাচ ভর্তি হয়েছে। আবার এরই মধ্যে ১৪তম ব্যাচ ভর্তির প্রক্রিয়া চলছে। ৩৮ টি বিভাগ ও ২ টি ইনস্টিটিউট মধ্যে ৩৬টি বিভাগ থেকে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর শেষ করলেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি সমাবর্তন।

স্নাতকোত্তর শেষ করা সমাজকর্ম বিভাগের শিশির ঘুষ বলেন, ‘প্রশাসনের স্বদিচ্ছার অভাবে হচ্ছে না সমাবর্তন।’ তবে গত মাসের টানা ২ দিনের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগামী বছরের ফেব্রুয়ারীতে সমাবর্তনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে।

জবিতে নামেমাত্র একটি মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একজন চিকৎসক। তাও ওষুধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়। তাছাড়া পরিধি বাড়ার পরিবর্তে পরিধি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। আগে ৩ রুম থাকলেও এখন ২রুমে সীমাবদ্ধ। অসুস্থ হলে প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন, স্যালাইন-জাতীয় প্রাথমিক ওষুধ ছাড়া কিছুই মেলে না মেডিকেল সেন্টার থেকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ক্যান্টিনে নিম্নমানের খাবার বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে ডাল ভাতের ব্যবস্থা করতে বললেও তাতে কর্ণপাত করেনি প্রশাসন। নিম্নমানের তেহারি ৪০-৪৫ টাকা করে বিক্রি করা হয়। তদারকিতেও চলছে নামে মাত্র। ফলে ক্যান্টিন ম্যানেজার ইচ্ছেমত দাম বাড়ান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছর ক্যান্টিনে খাবারের দাম বেড়েছে ২ দফায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাশেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রশাসনের লোকজন তো আর ক্যান্টিনের খাবার খান না, তাই তারা আমাদের সমস্যা বুঝবে কি করে?’

বিশ্ববিদ্যায়ের সার্বিক সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে জবি রেজিষ্ট্রার প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান বলেন, আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তবে আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করছি। আশা করি, কেরানীগঞ্জের নতুন ক্যাম্পাসে এসব সমস্যা থাকবে না।

বিষয়টি জানতে চাইলে জবি ভিসি অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, পুরান ঢাকায় জায়গা কম থাকায় অনেক কিছুই চাইলেও তা হয়ে উঠেনি। তারপরেও ছাত্রী হলের কাজ শেষ পর্যায়ে। তাছাড়া কেরানীগঞ্জের নতুন ক্যাম্পাসে মাস্টারপ্লানের মাধ্যমে যাবতীয় সমস্যা সমাধান করা হবে।

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: