কারেন্ট নিউজ বিডি
বৈশাখের আমন্ত্রণ
রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯ ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ণ
কারেন্ট নিউজ বিডি কারেন্ট নিউজ বিডি :

শৈশবের স্মৃতি বোধহয় উৎসবের আকার, গভীরতা, ব্যাপ্তি বা প্রাবল্যের পারদকাঠি। মনের জানালায় রাতচরা পাখির মতো যখন উড়ে আসে অতীত, ফিকে হয়ে আসা স্মৃতির ক্যানভাস চকিতে ভারি হয়ে যায়, নির্দ্বিধায় বলতে পারি- নববর্ষের স্নিগ্ধ স্মৃতিকণাগুলো ক্রমশ দখল করে নেয় মানসপটের দুর্লভ সংগ্রহশালা। এটি অত্যুক্তি হবে না যে, বাঙালি মননের যে বিস্তীর্ণ পরিসর নির্মল অনুভূতির চাদরে ঢাকা; তার অনেকটাই আবহমান সামাজিক উদযাপনের উপকরণে অলংকৃত। উচ্ছ্বাস, গাম্ভীর্য কিংবা মাধুর্য- যে মানদণ্ডেই ভাবি না কেন; বাঙালির বর্ষবরণ আপন ভুবনে স্বকীয় আবেদনে নিয়তই সারগর্ভী, বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য।

বাঙালির নববর্ষ নানা মাত্রিকতায় সমৃদ্ধ। এ শুধু মহাকালচক্রে ভেসে চলা সময়ের বিরামচিহ্ন নয়, বাংলা নববর্ষের দর্শনে নিহিত আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি। ভাষা যেমন রাজনীতির মানচিত্র মেনে চলে না, বৈশাখও তেমনিভাবেই বাঙালির রাজনৈতিক ভূগোলের সীমানা মুছে দিয়ে বিশ্বের ত্রিশ কোটি বাঙালিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উত্তাল বাঙালিয়ানার স্বপ্ন সৈকতে। ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-বর্ণ, নর-নারী, শিশু-বৃদ্ধ- এক অপ্রতিরোধ্য আবেগে, চেতনার অটুট বন্ধনে, সহজাত প্রবৃত্তির নৈকট্যে একাকার হয়ে যায়। অভিন্ন জাতীয়তাবোধের অবিশ্রান্ত স্রোত আছড়ে পড়ে সমাজের আনাচে-কানাচে, অলিগলিতে, মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে, কুটির, প্রাসাদ সবখানে।

নতুন বছর উদযাপনের রেওয়াজ ছড়িয়ে আছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। সংস্কৃতি-সামর্থ্য ভেদে বর্ষবরণের ব্যাকরণে বৈচিত্র্য আছে। ব্যক্তি-গোষ্ঠী-সমাজ তার ভিন্নতা নিয়েই এক অভিন্ন চেতনালোক গড়ে তোলে। আর সেখানেই বিবিধতার মাঝে ঐক্যের দার্শনিক অঙ্গীকার নিহিত। নববর্ষ বাঙালির কাছে পৃথিবীর সুন্দরতম দিন; যা মূলত এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মহোৎসব। বাংলা পঞ্জির মহৎ এই দিবসটির বিশালত্ব, অন্তর্গত সৌন্দর্য অস্তিত্ব সন্ধানী বাঙালি অনুভব করে অনাবৃত প্রকৃতির সবুজ ক্যানভাসে, অশ্বত্থ গাছের সৌম্য ছায়ায়, রাজপথ ভরে ওঠা অনিন্দ্য সুন্দর আলপনায়, চিত্রকরের কারুকাজে বাঙালির পরিণত মনস্কতায়। পোশাকে, অন্নব্যঞ্জনে, শিল্প সুষমায় বাঙালি এদিন অপরূপ; উৎসবময়তায় বহুজনীন, কল্পনা বিস্তারে শৃঙ্গস্পর্শী। দরিদ্র কৃষক হতে অধুনা কর্পোরেট সম্রাট- সবাই একই বৃত্তে আবর্তিত। রমনা বটমূলে রবীন্দ্র-নজরুল, ইলেকট্রনিক পর্দায় জনমোহিনী লোকউৎসব, রাজপথে বিশ্বঐতিহ্যের অংশীদার মঙ্গল শোভাযাত্রা- এত সবকিছুর রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ মেখে গাঙ্গেয় এ ব-দ্বীপ অনির্বচনীয় চেতনার রঙে মূর্ত হয়ে ওঠে। অতীতের অপূর্ণতা, অতৃপ্তিকে ছাপিয়ে জীবনকে পূর্ণতায় ভরিয়ে তোলার নিষ্পাপ আকুতি নিয়ে কালের অনন্ত বিস্তার বেয়ে এগিয়ে চলে সভ্যতার আলোকশিখা।

বঙ্গাব্দের উৎস প্রসঙ্গেও কয়েকটি মত প্রচলিত। এমনও ধারণা আছে, খ্রিস্টপূর্ব ৬৯১ সালে বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধের জন্মের প্রায় দেড়শ’ বছর আগে। কারও মতে, বাংলা নববর্ষ উৎসবের প্রচলন হয়েছিল মোগল সম্রাট আকবরের আমলে। কেউ বলেন সুলতান হোসেন শাহের সময়ে। কারও ধারণা, তিব্বতি এক শাসকের নাম থেকে বাংলা সনের উৎপত্তি। রাজা শশাঙ্ক বঙ্গাব্দের স্রষ্টা ও প্রবর্তক- এমন মত অনেকের। আবার এ কথাও চালু আছে যে, ইংরেজ আমলে এই উৎসবের শুরু; ইংরেজি নববর্ষের অনুকরণে। থার্টিফার্স্টের পর যেমন প্রবল পরাক্রমে আসে নিউ ইয়ার্স; তেমনিভাবেই চৈত্রসংক্রান্তির অবসানে বিপুল বৈভবে আসে রুদ্র বৈশাখ।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলা নববর্ষ পালনের মধ্য দিয়েই বাঙালির স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ লক্ষ করা যায়। জনমানসে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী ঢেউয়ের অভিঘাত ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরও শাসকবর্গের আধিপত্যবাদী ও ধর্মান্ধ মনোভাব বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগকে বারবার আঘাত করেছে। কিন্তু ভাষাভিত্তিক বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের সংকল্পে উচ্চশির এ জাতিগোষ্ঠী পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর বৈরী আচরণের প্রতিক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি; বরং আরও শক্তি সঞ্চয় করে নববর্ষ, ভাষাদিবস, রবীন্দ্র-নজরুল চর্চার মতো বিশুদ্ধ সংস্কৃতির পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে, সাংস্কৃতিক মানচিত্র হয়ে উঠেছে আরও বর্ণময়। এককথায়, অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনায় গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে মুষ্টিবদ্ধ শপথে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ভিত্তিই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ; যার অবলম্বন ছিল বাঙালি সংস্কৃতি। তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা, মেঘনা, যমুনা; আমি কে? তুমি কে? বাঙালি, বাঙালি- ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ইতিহাস নির্ধারক এমন উচ্চারণ ষাটের দশকজুড়ে, বিশেষ করে আগুনঝরা মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় বাঙালি জাতিকে এক অবিশ্বাস্য জাতীয়তাবাদী আবেগে উত্তাল করে তুলেছিল। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মুক্তির যৌক্তিক দাবিকে সামনে নিয়ে আসেন অবলীলায়। ’৪৭-র দ্বিজাতিতত্ত্ব নির্ভর ভারত বিভক্তির ঐতিহাসিক পটভূমিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ধারাবাহিক জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ফলে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি আধুনিক মানবিক জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয় মানব জাতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পর থেকে সমাজের অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়ার একটি ধারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সমকালীন বিশ্বব্যবস্থায় ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের কঠিন সংগ্রাম বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। শুধু ন্যায়ভ্রষ্টতার আধিপত্য নয়, মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র বাঙালি সংস্কৃতিকে দুর্বল করে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র দৃশ্যমান হতে থাকে। আর ’৭৫-এর পর সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে রুগ্ন ও দূষিত করে ফেলার সব আয়োজন একে একে সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর দুর্বলতার সুযোগে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে বাঙালির ইতিহাস, দর্শন, শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতি সর্বাত্মক আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

শুধু আমাদের শৈশব বা কৈশোরেই নয়, নিকট অতীতেও বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির নজরকাড়া স্ফুরণ সর্বত্র চোখে পড়েছে। অথচ বিগত তিন দশকে চৈত্রসংক্রান্তি, বৈশাখী মেলা, বর্ষবরণ, নবান্ন, পৌষমেলা, বাউল গান, কীর্তন, যাত্রাপালার মতো লোকজ উৎসব ক্রমাগত কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। ক্ষণিকের বাঙালিয়ানার কৃত্রিম মোড়কে পান্তা-ইলিশের প্যাকেজবন্দি কালচারে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। বাংলাপঞ্জি, বাংলা সংস্কৃতি; এমনকি বাংলা ভাষার ব্যবহারও ব্রাত্য হয়ে পড়ছে। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণে এখনও বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিকে অবরুদ্ধ করে ফেলার প্রবণতা চোখে পড়ছে। অথচ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণে ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, হিব্রু, হিন্দি, উর্দু শব্দের নির্বিচার ব্যবহারে কোনো গ্লানি নেই। দৈনন্দিন আলাপচারিতায় শুদ্ধ বা অশুদ্ধ ইংরেজি শব্দ ব্যবহারে যেমন শ্লাঘার অন্ত নেই। এমন সাংস্কৃতিক দ্বিচারিতা সমাজের একটি অংশের মনোজাগতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দেউলিয়াত্বের পরিচয় বহন করে। যে জাতি ভাষার জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছে, তার ক্ষেত্রে এমন স্খলন খুবই বেমানান। অন্যদিকে সমাজ বিন্যাসে বৈষম্য ও শিক্ষার পণ্যায়ন শিক্ষাক্রমের বিভক্তিকে অনিবার্য করে তুলছে, সমাজ-মননে যার সুদূরপ্রসারী অভিঘাত ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা নব্য ধনিকশ্রেণী লালিত ইংরেজি মাধ্যমে জারিত শিক্ষিত এলিট, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাদ্রাসা ফেরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বৃহত্তর অংশের প্রবহমান একটি মিশ্র ধারা জাতিরাষ্ট্রের সমস্বত্ব ভাষাগোষ্ঠীর মানস গঠনের প্রক্রিয়াকে শুধু জটিল করে তোলে তাই নয়; বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনকে নিশ্চিত করে জ্ঞানভিত্তিক আধুনিক জাতিগঠনের অভিন্ন আকাক্সক্ষাকেও বিপন্ন করে ফেলে।

বাংলার ঐতিহ্য ও চিরায়ত সংস্কৃতির কক্ষচ্যুত ধারাকে স্বমহিমায় পুনঃস্থাপন করার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চেষ্টা ও প্রণোদনার অন্ত নেই। বৈশাখী ভাতা থেকে শুরু করে জাতীয় ছুটি ঘোষণা; এমনকি রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয়তাবোধ উদ্দীপক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কিন্তু মানুষের মাঝে এই উৎসবগুলো পালনের জন্য সেই কালোত্তীর্ণ আবেগ বা স্বতঃস্ফূর্ত উদ্দীপনায় ভাটা পড়ছে কিনা, ভেবে দেখতে হবে। কেন যেন মনে হয়, শৈশবে পয়লা বৈশাখের যে দ্যুতি, যে উত্তাপ, যে শিহরণ মনকে আপ্লুত করেছে- তা আজ অনেকটাই শূন্য। কেন যেন আমরা মনে করি, বাংলা পঞ্জিকাটি শুধু হিন্দুদের সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে ব্যবহার্য। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলা সনের উৎপত্তি ও বিকাশের সঙ্গে হিন্দুদের যোগসূত্র খুবই নগণ্য। এটি তৈরি করেছে মুসলমানরা, প্রচলনও করেছে তারা। হিন্দুরা তা শুধু গ্রহণ করেছে বিয়ে, অন্নপ্রাশনের মতো আচার-অনুষ্ঠানে। বাংলা পঞ্জিকা ও সনও আজ বিভাজিত। ইংরেজি ১৪ এপ্রিল অনুসরণে বাংলা নববর্ষ চালু হয়েছে।

বাঙালির সাংস্কৃতিক মননের প্রতীক এই পয়লা বৈশাখ। ভৌগোলিক সীমারেখা ছাপিয়ে বিশ্বের সব বাঙালি অভূতপূর্ব জাতীয়তাবোধের আবেগে সময়পঞ্জির এই মাহেন্দ্রক্ষণে এক সুতায় বাঁধা পড়ে। এই সাংষ্কৃতিক ঐক্য অখণ্ড জাতিসত্তা নির্মাণে আজ ভীষণ জরুরি। বাংলার ভূ-প্রকৃতি ও সমাজ জীবনের সঙ্গে এই ঋতুবদল ও উৎসবগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত; কোনো ধর্ম-বর্ণের বাঙালিকে সাংস্কৃতিক জাতিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিচ্যুৎ করা মুশকিল। এখানেই বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যিক শক্তি নিহিত। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় সখ্য, তারই উৎসবময় রূপ এই বর্ষবরণ। মাটির সঙ্গে মানুষের বন্ধন চিরকাল অটুট। তবে এ কথাও ঠিক যে, সময়ের স্রোতে ভেসে উৎসবের অন্তর্গত চরিত্রও হয়তো বদলে যায়। কিছু পরিবর্তন প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই ঘটে থাকে- তা শাশ্বত ও বিবর্তনের সংকেতবাহী। প্রকৃতি ও মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত যে উৎসব, যে সংস্কৃতি; তাকে অগ্রাহ্য করা কঠিন। আর যে রূপান্তর আরোপিত, তা স্থায়ী হতে পারে না; সভ্যতা তাকে রুখে দেয়।

এ জনপদের ইতিহাস বলে, বাঙালি বৈরী শক্তির বশ্যতা মানেনি। পক্ষান্তরে বাংলা ভাষা, সমাজ ও সংস্কৃতি কালের যাত্রাপথে বহুজাতির সংস্পর্শে এসে ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়েছে, নিজস্ব চরিত্র এতটুকু হারায়নি। বাংলা নববর্ষ কিংবা ভাষা দিবস পালনের মতো উৎসব বাঙালি জাতিসত্তায় আন্তর্জাতিক মাত্রা যুক্ত করেছে, বিভিন্ন দেশের অজস্র বাঙালিকে এক অভিন্ন সংস্কৃতির কক্ষপথে সংযুক্ত করেছে। বাংলাদেশ এখন বিকাশমান অর্থনীতির দেশ। এ দেশের উপচে পড়া তারুণ্য এখন বিশ্বের নজরে। নতুন প্রজন্মের চোখে আজ আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। সম্ভাবনার দিগন্তরেখায় রুপালি আলোর ঝলক। ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাহলে বাংলা ভাষা, বাংলা সন কেন হীনম্মন্যতায় কুঁচকে থাকবে, কেন তার প্রাপ্য মর্যাদায় এ জাতি স্ফীতবক্ষ হবে না? বিশ্বের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সামনে বাংলা সংস্কৃতির এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে মেলে ধরার আগে নিজের দেশ, নিজের সমাজ, নিজের সংস্কৃতি ও নিজের ভাষাকে সম্মান করতে হবে। এটাই তো দেশপ্রেম, এটাই বাঙালির জাতীয়তাবোধ।

বৈশাখ শুধু একটি মাস নয়; একটি প্রেরণা, একটি অনন্য অনুভূতি, পৃথক এক জীবনবোধ, অবিশ্বাস্য আত্মশক্তি। বৈশাখের আবহে আছে তারুণ্যের উদ্বেল উপস্থিতি, বিদ্রোহের আভাস, বাঁধন ছিঁড়ে দেয়ার ইঙ্গিত। বৈশাখ যে শিক্ষা দেয় তা ন্যায্যতার, সত্যের ও দ্রোহের। বৈশাখ শুভবোধ, কল্যাণকর চেতনার প্রতিরূপ। বৈশাখের শিক্ষা হল, মন্দকে মন্দ বলার সাহস অর্জন। বুদ্ধি ও যুক্তিকে শাণিত করার শক্তি। সংস্কৃতির আবহমান বিচরণ ক্ষেত্র যেন কোনো দখলদারের আগ্রাসনে বিপন্ন না হয়, তা নিশ্চিত করার প্রেরণা। মনোজগৎ যাতে অশুভের ছায়ায় আচ্ছন্ন না হয়, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ যেন কোনোভাবে রুদ্ধ না হয়, সমাজের শুদ্ধ পরিসর যেন প্রবলের অনুগত হয়ে না পড়ে- বৈশাখ বাঙালি মননকে এমনই অন্তর্দৃষ্টিতে ঋদ্ধ করে; অপরাজেয় আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে। বৈশাখ আনন্দ সন্ধানী, আলোর দিশারি, বিভেদ বিনাশী। সেই বিনাশেই নতুনের আমন্ত্রণ; নতুনের জয়গান। তাই শেষ হয়েও এই উৎসবের আবহে শেষ নেই। তা অনন্ত, তা অনাদি।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

principalffmmc@gmail.com